বাংলার ইতিহাসে বর্গী আক্রমণ এক রক্তাক্ত অধ্যায়, যা চিরকাল বাঙালির স্মৃতিতে গেঁথে রয়েছে। শিশুদের ঘুমপাড়ানি গানেও এর ছায়া পড়েছে:
“ছেলে ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো বর্গী এল দেশে, বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে।”
এই কবিতা শুধু একটি ছড়া নয়, বরং বাংলার কৃষকসমাজের এক গভীর আতঙ্ক ও দুঃখের প্রতিচিত্র। কিন্তু বর্গী কারা ছিল? কীভাবেই বা তারা বাংলার জনজীবনে ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল?
‘বর্গী’ বলতে বোঝানো হয় মারাঠা বাহিনীর সেই সংঘবদ্ধ অশ্বারোহী লুটেরাদের, যারা মূলত ১৭৪১ থেকে ১৭৫১ সালের মধ্যে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে লুটপাট চালিয়েছিল। মারাঠা সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনীতে দুই ধরনের সৈন্য ছিল—একদল ছিল ‘বারগির’ বা সরকারি সরঞ্জামে সজ্জিত অশ্বারোহী, আরেক দল ছিল ‘সিলহাদার’, যারা নিজেদের খরচে যুদ্ধ করত। এই বারগির বাহিনীই বাংলার মানুষদের কাছে ‘বর্গী’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
বাংলা তখন মুগল শাসনের অধীনে ছিল, আর নওয়াব আলীবর্দী খান ১৭৪০ সালে বাংলার শাসনভার গ্রহণ করেন। ঠিক সেই সময় থেকেই বাংলার ওপর বর্গীদের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে। ১৭৪২ সালের ১৫ এপ্রিল তারা প্রথমবার বাংলার বর্ধমান আক্রমণ করে। বর্গী বাহিনীর প্রধান ছিলেন ভাস্কর পণ্ডিত। তিনি অত্যন্ত কৌশলীভাবে নওয়াবের রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে তার বাহিনীকে দুর্বল করে তোলেন।
নওয়াব আলীবর্দী খান প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও ২৬ এপ্রিল তিনি কোনওরকমে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে যান। এরপর বর্গীরা মুর্শিদাবাদে হামলা চালায়, যা ছিল বাংলার প্রশাসনিক কেন্দ্র। ৬ মে তারা শহরে প্রবেশ করে এবং বাজার-ঘাট জ্বালিয়ে দেয়। সে সময় মুর্শিদাবাদে ছিলেন না নওয়াব, ফলে বর্গীদের আক্রমণ ভয়াবহ রূপ নেয়। জগৎ শেঠ নামের এক ধনী ব্যবসায়ীর কাছ থেকে তারা তিন লাখ টাকা আদায় করে।
বর্গীদের অত্যাচারে বাংলার অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা শুধু নগদ অর্থ লুট করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং ফসলের মাঠ, গরু, ধানের গোলা—সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। বাংলার বিখ্যাত রেশমশিল্পের বাজার ‘আড়ং’ একেবারে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে এবং খাদ্য সংকট দেখা দেয়। খাজনা আদায়ের ক্ষমতা হারায় স্থানীয় জমিদারেরা, কারণ সাধারণ কৃষকের আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।
বর্গীরা যখনই কোনও গ্রাম আক্রমণ করত, তখন তারা ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিত, ফসল লুট করত, আর মানুষের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার চালাত। ধনসম্পদ লুটের পাশাপাশি তারা মানুষকেও ধরে নিয়ে যেত। বাংলার জনগণ এতটাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল যে, বহু পরিবার গঙ্গার পূর্বদিকের অঞ্চলে (বর্তমান বাংলাদেশ) পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
বর্গী আক্রমণের পেছনে একজন বাংলা-জানানো অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকের হাত ছিল—তার নাম মীর হাবিব। তিনি ছিলেন নওয়াব আলীবর্দী খানের ঘনিষ্ঠ, কিন্তু লোভের বশে তিনি বর্গীদের সহায়তা করতেন। মীর হাবিব বাংলার ভূগোল ও প্রশাসন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখতেন, যা বর্গীদের জন্য বাংলায় আক্রমণ পরিচালনায় সহজতর করেছিল।
১৭৪২ সালে নওয়াব আলীবর্দী খান কঠোরভাবে সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি বাংলাকে বর্গীমুক্ত করবেন। ১৭৪৩ সালে তারা মেদিনীপুর আক্রমণ করলে নওয়াব কৌশলগতভাবে তাদের পরাজিত করেন। এরপর ১৭৪৪ সালে আবারও ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে বর্গীরা বাংলা আক্রমণ করে, কিন্তু এবার নওয়াব আলীবর্দী খান ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেন। তিনি ভাস্কর পণ্ডিতকে বৈঠকের আমন্ত্রণ জানান, যেখানে বর্গী সেনাদের ওপর আকস্মিক হামলা চালিয়ে তাদের নির্মূল করেন।
১৭৫০ সালে বর্গীরা আবার বাংলায় আক্রমণ চালায়, এবং ১৭৫১ সালে এ আক্রমণের তীব্রতা এতই বেড়ে যায় যে নওয়াব আলীবর্দী খান বাধ্য হয়ে মারাঠাদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করেন। এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, তিনি উড়িষ্যার অধিকার ছেড়ে দেন এবং বার্ষিক বারো লক্ষ টাকা চৌথ কর বাবদ মারাঠাদের প্রদান করেন। যদিও চুক্তি অনুযায়ী মারাঠারা বাংলায় আর আক্রমণ করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ১৭৫২ সালে মীর হাবিব নিহত হওয়ার পর উড়িষ্যা আবার মারাঠাদের অধিকারে চলে যায়।
বর্গীদের আক্রমণের ফলে বাংলার অর্থনীতি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে, কয়েক বছরের মধ্যেই ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলা ইংরেজদের কাছে পরাজিত হন। অর্থাৎ বর্গীদের লুটতরাজ বাংলা শাসনের ভিত দুর্বল করে দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসনের পথ প্রশস্ত করে।
বাংলার ইতিহাসে বর্গী আক্রমণ শুধু লুটপাটের এক কালো অধ্যায় নয়, বরং এটি ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতিফলন। বাংলার মাটিতে বারবার বিদেশি আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু বর্গীদের আক্রমণ ছিল সাধারণ মানুষের জন্য ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন। এ কারণে আজও ‘বর্গী এল দেশে’ ছড়াটি বাংলার লোকসংস্কৃতিতে বেঁচে আছে, বাঙালির শেকড়ের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়।
3 Responses
Kemon holo lekha ta bolben